মোঃ খলিলুর রহমান, বাউফল : একসময় দক্ষিণাঞ্চলের নৌ-যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল প্রাণকেন্দ্র থাকা তেতুলিয়া নদী এখন তীব্র নাব্যতা সংকটে ধুঁকছে। এই সংকটের কারণে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কালাইয়া বন্দর, কালাইয়া লঞ্চঘাট এবং ঢাকা-কালাইয়া ও কালাইয়া-লালমোহন নৌরুট আজ কার্যত হুমকির মুখে পড়েছে। নদীর বিভিন্ন স্থানে জেগে ওঠা চরের কারণে নৌযান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আঞ্চলিক অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, মৎস্য খাত এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, ট্রলার মালিক ও জেলেদের অভিযোগ, নদীর তলদেশে ডুবোচর সৃষ্টির ফলে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পণ্যবাহী কার্গো ও ট্রলার নিরাপদে চলাচল করতে পারছে না। অনেক সময় ডুবোচরে ধাক্কা লেগে নৌযান ও পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যবসায়িক কার্যক্রমও থমকে গেছে।
উদাহরণস্বরূপ, নাজিরপুর এলাকা থেকে লালমোহনগামী ট্রলারগুলোকে বর্ষা মৌসুমেও নাব্যতা সংকটের কারণে প্রায় ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত সময় ও জ্বালানি ব্যয়ের পাশাপাশি যাত্রীদের দুর্ভোগও বহুগুণ বেড়ে গেছে।
ঢাকা-কালাইয়া রুটে চলাচলকারী লঞ্চ সংশ্লিষ্টরা জানান, নদীর বিভিন্ন স্থানে পানির গভীরতা কমে যাওয়ায় নিরাপদ চলাচল দুরূহ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
নাব্যতা সংকটের কারণে গলাচিপা, দশমিনা, কালাইয়া, নিমদী, নুরাইপুর ও কালিশুরীসহ দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক নৌঘাটে দ্বিতল লঞ্চ চলাচল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে কালাইয়া থেকে ঢাকাগামী মাত্র একটি দ্বিতল লঞ্চ কোনোমতে চলাচল করছে।
এ বিষয়ে ওই লঞ্চের প্রথম শ্রেণির মাস্টার মো. হানিফ বলেন, ‘‘একসময় ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের এই নৌরুটে অসংখ্য স্টেশন ছিল। এখন নাব্যতা সংকটের কারণে প্রায় ৯০ শতাংশ স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে যাত্রীসংখ্যাও অনেক কমে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একাধিকবার পরিদর্শন করে আশ্বাস দিলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’’
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) তেতুলিয়া নদীতে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করলেও যেখানে নাব্যতা সংকট প্রকট, সেখানে পর্যাপ্ত খনন করা হচ্ছে না। বরং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আবেদনের ভিত্তিতে বাড়িঘর ও ভিটা ভরাটে বালু সরবরাহে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা সরকারের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে বিআইডব্লিউটিএর হাইড্রো সলিউশনের প্রকৌশলী তানভীর মজুমদার বলেন, ‘‘সরকারি বিধি অনুসারে আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই করেই বালু সরবরাহ করা হয় এবং এ জন্য কোনো অর্থ নেওয়া হয় না।’’
এদিকে, বাউফল উপজেলার সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক, সেতু ও আবাসন নির্মাণে ভিটি বালুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত বালু সরবরাহ না থাকায় অনেক উন্নয়নকাজও ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পরিস্থিতি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ বলেন, ‘‘তেতুলিয়া নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে কালাইয়া বন্দর ও যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হবে এবং সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।’’
স্থানীয় ব্যবসায়ী, ট্রলার মালিক, জেলে ও সচেতন নাগরিকদের জোরালো দাবি, পরিবেশগত ও আইনগত বিধান মেনে জরুরি ভিত্তিতে তেতুলিয়া নদীতে পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং পরিচালনা করা হোক। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে এনে কালাইয়া বন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে স্বাভাবিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবন আবার নতুন গতি ফিরে পাবে।







