দুমকি প্রতিনিধি : পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামে পায়রা নদীর তীব্র ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে শত শত পরিবার। বছরের পর বছর ধরে চলা এ নদীভাঙনে বাপ-দাদার পৈতৃক ভিটা হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নদী শাসনের সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা না থাকায় এবং আবাসন ও বিদ্যুতের সংকটে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এলাকার কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর করাল গ্রাসে পুরো বাহেরচর এলাকা ক্রমান্বয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই ভাঙনে ইতোমধ্যে শত শত ঘরবাড়ি নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে অনেকে ৮ থেকে ১০ বার বসতঘর সরাতে বাধ্য হয়েছেন। সর্বশেষ ভাঙনে নতুন করে গৃহহীন হয়ে পড়েছে অন্তত ৩০টি পরিবার, যারা এখন রাস্তার পাশে অস্থায়ী আশ্রয় নিয়ে চরম দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছেন।
ভাঙনের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে ৩২ নম্বর আংগারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টার, সিকদার বাড়ি জামে মসজিদ ও মোল্লা বাড়ি। স্থানীয়রা জানান, ভাঙন অব্যাহত থাকলে অচিরেই এসব প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। সাইক্লোন শেল্টারটি হারিয়ে গেলে যেকোনো দুর্যোগের সময় আশ্রয় নেওয়ার মতো আর কোনো জায়গা থাকবে না বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
দুর্ভোগের কথা জানাতে গিয়ে নিটুলী রানী বলেন, ‘‘এ পর্যন্ত সাতবার ভিটেমাটি হারিয়েছি। শেষ আশ্রয়টুকুও নদী কাড়লে আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশে একটা ভাঙা ঘরে এসে উঠেছি। এখন আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।’’
আরেক ভুক্তভোগী জাকির খান আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘কত মানুষ আইলো, কত কথা কইলো, কাজের কাজ কিছুই হইলো না। আপনারা এসে কথা বললেও কি লাভ হবে? আমাদের দিকে তো কেউ তাকায় না।’’ রিপন মাল জানান, নদীভাঙনের কারণে তিনিও পাঁচ-ছয়বার ঘর পরিবর্তন করে অবশেষে বাজারে ভাড়া বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন।
স্থানীয় বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন সিকদার বলেন, ‘‘ভাঙনে এ পর্যন্ত আমাদের সাড়ে তিনশ একর জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। ১৯৭৭-৭৮ সালে নদীর অপরপ্রান্তে বাকেরগঞ্জের একটি চরে ৬০টি পরিবারের জন্য ৯০ একর জমি সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া হলেও স্থানীয়দের জবরদখলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কোনো পরিবার সেই জমি বুঝে পায়নি।’’
একই এলাকার বাদল চৌকিদার আক্ষেপ করে বলেন, ‘‘আমাদের সহায়-সম্বল কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই। বাধ্য হয়ে রাস্তায় বাস করছি।’’ তিনি প্রশাসনের কাছে দ্রুত পুনর্বাসনের আকুল আবেদন জানান।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও প্রকাশ করেছেন চরম উদ্বেগ। স্থানীয় ইউপি সদস্য শাহীন গাজী জানান, পায়রার অব্যাহত ভাঙনে তার পুরো ওয়ার্ডটিই আজ বিলুপ্তির পথে। ইউপি চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) মো. জিল্লুর রহমান বাহেরচর গ্রামের অস্তিত্ব রক্ষা ও ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি সহায়তায় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান।
এ বিষয়ে দুমকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী জানান, ‘‘ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ত্রাণসহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি নদীভাঙন রোধে স্থায়ী টেকসই বাঁধ তৈরিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে আলোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’’
বাহেরচরবাসীর একটাই আকুল দাবি—জরুরি ভিত্তিতে নদী শাসন ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ না করা হলে অচিরেই মানচিত্র থেকে পুরোপুরি মুছে যাবে ইতিহাসসমৃদ্ধ এই বাহেরচর গ্রাম।







