জহিরুল ইসলাম, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টারঃ পটুয়াখালী দুমকি উপজেলার লেবুখালী ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের মৃত কাঞ্চন আলী মল্লিকের ছেলে আইয়ুব আলী মল্লিকের নামে “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দুমকি উপজেলায় নিরাপদ পানি সরবরাহ” প্রকল্পের আওতায় একটি গভীর নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকল্প সমাপ্ত হলেও তার বাড়িতে কোন নলকূপ স্থাপন করা হয়নি। অথচ স্থানীয় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর দেখিয়েছে আইয়ুব আলীর বাড়িতে ৩শ ১১ দশমিক ৯৬ মিটারের গভীরতায় একটি সচল নলকূপ উল্লেখ থাকলেও এই বাড়িতে কোন নলকূপ স্থাপন হয়নি।
তবে আইয়ুব আলী মল্লিকের বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে মোঃ নাসির উদ্দীন নামের এক ব্যক্তির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পেছনে টয়লেটের মাঝে আইয়ুব আলীর নামেই স্থাপন করা হয়েছে। এদিকে প্রতিটি নলকূপের বিপরীতে উপকার ভোগীদের কাছ থেকে সরকারী ফি’র বাহিরেও ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিরা অবৈধ লেনদেন করেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুধু আইয়ুব আলী নয়, এই প্রকল্পের অধিকাংশ জায়গায় বেশ কয়েকটি অনিয়ম দেখা গেছে।
২০২০ সালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট পটুয়াখালী জেলায় দুমকি উপজেলায় এই প্রকল্পের আওতায় ১ কোটি পঞ্চাশ লক্ষ টাকা ব্যয়ে স্থানীয় নাগরিকদের পর্যাপ্ত পরিমাণ নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, পানি সরবরাহের কভারেজ বৃদ্ধি ও জনগণের পানি বাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব হ্রাসকরণে ১শ ৫৫টি গভীর নলকূপ স্থাপন প্রকল্প অনুমোদন করে।
ট্রাস্টের ৫২ তম সভায় ২০২০ সালে মার্চ মাসে প্রকল্পটি অনুমোদন পাওয়ার পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়নের নির্দেশ প্রদান করে। পরে স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান ড. হারুন অর রশীদ হাওলাদার তার নিজস্ব প্যাডে প্রকল্পের ১৫৫জন উপকার ভোগীর তালিকা জমা করেন। তালিকা অনুযায়ী একই বছর দুইটি প্যাকেজে নলকূপ স্থাপন টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। কার্যাদেশ পেয়ে এম/এস কামাল ও এম/এস তারিফ এন্ড কোং নলকূপ স্থাপন শুরু করে।
উপকার ভোগীদের নাম, পিতার ও ঠিকানা অনুযায়ী বরাদ্দ থাকলেও নীতিমালায় একটি বাড়িতে একটি সরকারি নলকূপ স্থাপনের কথা থাকলেও মানা হয়নি কোন নিয়ম। কারও কারও নলকূপ বসেছে একক পরিবারের রান্না ঘর বা টয়লেটের পাশে। এছাড়াও নীতিমালায় নাম থাকলেও আজ পর্যন্ত কোন নলকূপ বুঝে পায়নি অনেকেই।
এরকমই একজন আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডে আবু জাফর জোমাদ্দার। তালিকায় নাম থাকলেও আজ পর্যন্ত বসেনি টিউবওয়েল। তার আশপাশের আরও ৫টি পরিবার ১/২ কিলোমিটার দূর থেকে পানি টেনে পান করছে। নিত্য প্রয়োজনীয় কাজসহ নারী ও শিশুরা গোসল ও শৌচা কার্য করছেন নোংরা পরিত্যাক্ত জলাশয়ের পানি দিয়ে। এছাড়াও মুরাদিয়া ইউনিয়নে ২নং ওয়ার্ডের হাবিবুল্লাহ, ৭নং ওয়ার্ডের মান্নান হাওলাদার, সুমন ফকির, সোহেল মীর ও ৯নং ওয়ার্ডের লিটন হাওলাদারসহ অসংখ্য মানুষ নিরাপদ পানির কষ্টে হাহাকার করছেন।
লেবুখালী ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের মৃত্যু আখতার সরদারের ছেলে ইউনুস সরদারের নামে একটি নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এটি তার রান্না ঘরে পাশে বসানো হয়। কিন্তু এই বাড়িতে পাশাপাশি তিনটি মাত্র ঘর থাকলে, একই বাড়িতে অন্য প্রকল্পের আরও দুইটি নলকূপ থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের বরাদ্দে আরও একটি নলকূপ বসানো হয়। এটিও একক ভাবে বসানো হয়। বেশির ভাগই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয় স্বজন ও কর্মী, ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের বাড়িতে। অধিকাংশ পরিবার আর্থিক ভাবে সচ্ছল ও সাবলম্বী। এরা সকলেই নলকূপের সঙ্গে বৈদ্যুতিক মটর সংযোগ লাগিয়ে পানির ট্যাংক ব্যবহার করেছেন। অথচ এই প্রকল্প প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও নিম্ন আয়ে গ্রামের মানুষের নিরাপদ পানির সুবিধা প্রদান ছিলো মূল উদ্দেশ্য। যা ৯৫% শতাংশ পূরণ করা হয়নি।
ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন, মনিটরিং ও রক্ষণাবেক্ষণে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে এত অনিয়ম ও অব্যবস্থপনার বিষয় টি মাথায় না নিয়েই নামমাত্র ও ছন্ন ছাড়া অবস্থায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সংস্থাটি। এই প্রকল্প ছাড়াও এই অধিদপ্তরের নিরাপদ পানি সরবরাহে আরও কয়েকটি প্রকল্প চলমান আছে। তাতেও যে যার মত করে সরকারি নলকূপের এককত্ব দখল নিয়ে আছে। অথচ এই উপজেলায় এখন নিরাপদ পানির অভাবে আছে শত শত পরিবারের হাজার হাজার মানুষ।
আমরা প্রকল্পের কয়েকজন উপকার ভোগীদের সঙ্গে কথা বলেছি। এদের মধ্যে লেবুখালী এক নং ওয়ার্ডের শাহআলম খান বাড়ির নাসিমা বেগম জানান, সরকারি এই নলকূপটি পেতে তাদের খরচ হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডে সৈয়দ বাড়িতে একই প্রকল্পের নলকূপ বসেছে ৫টি। তারা সবাই সরকারী দলের রাজনৈতিক কর্মী। তাদেরও একটি নলকূপের জন্য ১৫/২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপকারভোগীর ভাইয়ের ছেলে ইমরান হোসন ও উপকার ভোগী সৈয়দ শাহিনের স্ত্রী সৈয়দ জাহিদা বেগম। এছাড়াও মুরাদিয়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডে মজিদ হাওলাদারের ছেলে খলিলুর রহমানের নাম জলবায়ু ট্রাস্টের প্রকল্পে থাকলেও নলকূপ বসেছে অন্য প্রকল্পের। একই নামে দুইটি নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হলেও একটি বসিয়ে অন্যটিও বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরাও একে অপরের উপর দোষ চাপাচ্ছেন। কেউ দাপ্তরিক অ-সক্ষমতা ও জনবল সংকট ও রাজনৈতিক প্রভাবের কথাও বলেছেন। এই সুযোগে ফায়দা লুটে নিচ্ছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা, সরকারি প্রকল্পের টাকায় নিজেদের ভোটের রাজনীতি শক্ত করছেন। লুটে নিচ্ছে অবৈধ অর্থ।
এবিষয়ে দুমকি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোসাঃ নিপা বেগম বলেন, আমরা মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর থেকে তালিকা পেয়ে, সে অনুযায়ী টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, তালিকায় থাকা ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করে সাইট নির্ধারণ করে দেই। সেখানে ঠিকাদার নলকূপ বসায়। তবে এক বাড়িতে অনেক সরকারি নলকূপ বা কেউ টয়লেট বা রান্না ঘরে বসিয়েছে, এমন অভিযোগ পাইনি। আমরা তদন্ত করে দেখবো। তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের শতভাগ কাজ সম্পন্ন, তবে ঠিকাদার এখন এক কিস্তি বিল বাকি আছে।
প্রকল্পের পরিচালক ও গোপালগঞ্জের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়েজ আহমেদ বলেন, আমাদের গাইড লাইন আছে, কোন বাড়িতে সরকারি কোন নলকূপ থাকলে, নতুন করে কোন নলকূপ স্থাপনের সুযোগ নেই। প্রকল্পের ডিপিপিতে সাইট সিলেকশন করা থাকে, বাহিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানের থেকে তালিকা পাই, সে অনুযায়ী কাজ করি। তবে আগে কে কে নলকূপ পাইছে, না পাইছে এসব তথ্য আমাদের কাছে থাকে না। আমরা শুধু কাজটা বাস্তবায়ন করি।
দুমকি উপজেলা চেয়ারম্যান ড. হারুন অর রশীদ হাওলাদার, সকল অনিয়ম ও অবৈধ লেনদেন বিষয় অস্বীকার করে বলেন, আমরা স্থানীয় চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের মাধ্যমে তালিকা তৈরি করে অনুমোদন করিয়ে এনে দেই। তারপর এটা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মিলে বাস্তবায়ন করে। তারা কোথায় কি করে জানি না। কেউ যদি আমার নামে অবৈধ অর্থ লেনদেন করে থাকে, তাহলে আমার করার কিছু নেই।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সরকারের অতিরিক্ত সচিব মোঃ জয়নাল আবেদীন বলেন, যে সকল অভিযোগ গুলো আসছে, তা অবশ্যই নিন্দনীয়। আসলে আমাদের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কোন জনবল নেই। ট্রাস্টি বোর্ডের সভায় অনুমোদিত তালিকা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বাস্তবায়নের জন্য পাঠিয়ে দেই। তারা তাদের নীতিমালা অনুযায়ী ও জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করে। তবে তারা কে কি রকম কি করে, তা আমাদের কেউ না জানালে, জানতেও পারিনা। প্রকল্প বাস্তবায়নে আমরা সম্পূর্ণ অন্য দপ্তরের উপর নির্ভরশীল। যারা বাস্তবায়ন করে, তারা কেউ আমার অধীনস্থ নয়, যে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। আমরা পারি তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে। এটাই নিয়ম, মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প দেখার মত সক্ষমতা নেই। আমরা অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নিবো।







