একটি দেশকে সবুজায়নের অমল ধারা তা শুধুই পরিবেশনীতির একটি অভিব্যক্তি নয়; তা হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি একটি নৈতিক অঙ্গীকারের উজ্জ্বল স্বাক্ষর। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব যদি জনসাধারণকে নির্দিষ্ট সময়সীমায় বিশাল পরিমাণ গাছ রোপণের প্রতিশ্রুতি দেন, তাহলে সে প্রতিশ্রুতিটি সাহসী কেবল নয়, বরং কৌশলগত ও নীতিগত দৃষ্টিকোণ থেকেও সময়োপযোগী; কারণ জলবায়ু ঝুঁকি, উপকূলীয় ভাঙন ও নগর তাপদ্বীপ এসব চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় বড় ধরনের উদ্যোগ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এই ব্যপক প্রস্থানের মধ্যেই তারেক রহমানের ঘোষিত ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের অঙ্গীকার একটি দৃষ্টান্তস্থাপিত রাজনৈতিক-পরিবেশগত উদ্যোগে রূপান্তরিত হয়েছে যেখানে সংখ্যা পাশে আছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, স্থানীয় অংশগ্রহণ ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিশ্রুতি।
এই কর্মসূচি যদি কেবল উপহাস্য বা মোহিত অনুষ্ঠানের বাইরে থেকে বাস্তবায়িত হয়—অর্থাৎ জিআইএস-ভিত্তিক জমি নির্ধারণ, দেশীয় প্রজাতির অগ্রাধিকার, স্কুল-ভিত্তিক পরিবেশ শিক্ষা, সামাজিক বনায়ন ও ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে তাহলে প্রতিটি চারা কেবল গাছ নয়, হবে দেশের জলবায়ু-সহনশীলতার একটি স্তম্ভ। আর যদি এই লক্ষ্যমাত্রাকে ভুলে পুরোনো বনবিঘ্ন ও উন্নয়নগত কাটা-ছেঁড়ার সঙ্গে পুঁজিপরকভাবে টোকা দেওয়া হয়, তাহলে নতুন গাছের ছায়ায় পুরাতন বনবিবর্জ্য ঢেকে যাবে, এবং অর্জিত সুফল সাময়িক হয়ে যাবে। তাই এই আগামী পাঁচবছরের পদক্ষেপকে মানুষ ও প্রযুক্তির মিলিত ঐক্যে পরিণত করা দরকার এটাই হবে প্রকৃত সবুজ নিরাপত্তার পথ।
একটি পূর্ণবয়স্ক বৃক্ষ কেবল ছায়া দেয় না; এটি বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, অক্সিজেন সরবরাহ করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল তৈরি করে। উপকূলীয় অঞ্চলে গাছ ঘূর্ণিঝড়ের গতি কমাতে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি কমায় এবং নগরাঞ্চলে তাপদ্বীপের প্রভাব হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সবুজায়নকে এখন শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয় হিসেবে নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
দেশব্যাপী বৃহৎ পরিসরের বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা পরিবেশ বিষয়ে নীতিগত অগ্রাধিকারের একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। সামাজিক বনায়ন সম্প্রসারণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী শক্তিশালী করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর বন ব্যবস্থাপনার মতো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের পরিবেশগত সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ আরও কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে শুধু চারা রোপণ করলেই লক্ষ্য পূরণ হয় না। অনেক সময় বিপুলসংখ্যক চারা লাগানো হলেও পরিচর্যার অভাবে সেগুলোর বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। তাই প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি হবে কতটি গাছ সুস্থভাবে বেড়ে পূর্ণবয়স্ক বৃক্ষে পরিণত হলো। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, স্থানীয় সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ।
বনভূমি সংরক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নতুন গাছ লাগানোর পাশাপাশি বিদ্যমান বন রক্ষা, অবৈধ দখল ও নির্বিচারে গাছ কাটা প্রতিরোধ এবং উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের সময় পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ একদিকে নতুন চারা রোপণ এবং অন্যদিকে পুরোনো বন ধ্বংস এই দ্বৈত বাস্তবতায় কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করা কঠিন। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি বন ব্যবস্থাপনাকে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। স্যাটেলাইট তথ্য, জিআইএস, ড্রোন এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কোথায় কোন গাছ লাগানো হবে, কতটি গাছ টিকে আছে এবং কোথায় পুনরায় বনায়নের প্রয়োজন এসব তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করা সম্ভব। এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করলে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী হতে পারে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও এই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে। শিশু ও তরুণদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তোলা গেলে বৃক্ষরোপণ একটি মৌসুমি কর্মসূচি না হয়ে আজীবনের সামাজিক দায়িত্বে পরিণত হবে। বিদ্যালয়ভিত্তিক পরিবেশ ক্লাব, ক্যাম্পাস বনায়ন এবং স্থানীয় উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রকৃতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করতে পারে। সবুজ অর্থনীতির সম্ভাবনাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নার্সারি শিল্প, ফলজ ও বনজ চারা উৎপাদন, পরিচর্যা, গবেষণা এবং পরিবেশভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন ও কার্বন বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সুযোগও বাড়তে পারে, যদি বন সংরক্ষণ ও কার্বন শোষণের তথ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সংরক্ষণ করা যায়। উপকূলীয় অঞ্চলে পরিকল্পিত বনায়ন জলবায়ু অভিযোজনের একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে। দেশীয় প্রজাতির গাছের মাধ্যমে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুললে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি কমানো, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
পরিশেষে, সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তোলা কোনো একক প্রতিষ্ঠান, কোনো একক ব্যক্তি কিংবা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের কর্মসূচির সীমায় আবদ্ধ নয়; এটি এক মহৎ জাতীয় দায়, যেখানে রাষ্ট্রের নীতি, স্থানীয় সরকারের উদ্যোগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা, গবেষকদের জ্ঞান, পরিবেশবিদদের দূরদৃষ্টি, গণমাধ্যমের সচেতনতা এবং সাধারণ মানুষের আন্তরিক অংশগ্রহণ একসূত্রে গাঁথা হলে তবেই সফলতার সুর বাজে। পরিকল্পনা যদি হয় দূরদর্শী, বিজ্ঞান যদি হয় পথপ্রদর্শক, প্রযুক্তি যদি হয় সহায়ক আর নাগরিক মনন যদি হয় দায়িত্বশীল, তবে এই উদ্যোগ কেবল একটি কর্মসূচি হয়ে থাকবে না এটি হয়ে উঠবে বাংলাদেশের পরিবেশগত পুনর্জাগরণের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী, তারুণ্যের অহংকার দেশনায়ক তারেক রহমানের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের অঙ্গীকার তাই নিছক সংখ্যার হিসাব নয়; এটি এক রাষ্ট্রীয় আত্মবিশ্বাসের উচ্চারণ, এক দূরদর্শী স্বপ্নের নাম।
এই স্বপ্ন যদি যথাযথ পরিকল্পনা, জনসম্পৃক্ততা, বৈজ্ঞানিক বাস্তবায়ন এবং অবিরাম পরিচর্যার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়, তবে বাংলাদেশ শুধু সবুজই হবে না, হবে আরও স্থিতিশীল, আরও সহনশীল এবং আরও বাসযোগ্য। আজ যে চারা নিঃশব্দে মাটিতে শিকড় গাঁথে, আগামী দিনে সেটিই হয়ে উঠবে ছায়া, শ্বাস, জীবিকা ও নিরাপত্তার প্রতীক। এ কারণেই বৃক্ষরোপণকে মৌসুমি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক পবিত্র অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণ করাই হবে সময়ের দাবি। উন্নয়ন আর প্রকৃতি এই দুইয়ের মাঝে সমন্বয় ঘটাতে পারলেই একটি জাতি সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যায়। সেই সমন্বয়ের পথে যদি আমরা সবাই একসঙ্গে হাঁটি, তবে ২৫ কোটি চারা কেবল একটি পরিসংখ্যান থাকবে না; তা হয়ে উঠবে এক নতুন বাংলাদেশের জন্মভূমি সবুজ, সাহসী ও সম্ভাবনায় দীপ্ত।
লেখক : প্রফেসর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান
ভাইস-চ্যান্সেলর, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়







