জিয়াউর রহমান, মির্জাগঞ্জ : পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় প্রমত্তা পায়রা নদীর তীব্র ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উপজেলার দেউলী সুবিদখালী, কাকড়াবুনিয়া, মজিদবাড়িয়া ও মির্জাগঞ্জ ইউনিয়ন পায়রা নদীর তীরবর্তী হওয়ায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে এখানে ভয়াবহ রূপ নেয় নদীভাঙন। এতে একের পর এক বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, কবরস্থানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
চলতি বর্ষা মৌসুমে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে মির্জাগঞ্জ ইউনিয়নের পিপড়াখালি গ্রামে। নদীর ভাঙন এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খান বাড়ির ৫০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক পাকা কুয়েতি মসজিদটি বিলীন হওয়ার দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে। মসজিদের ঠিক সম্মুখভাগ পর্যন্ত মাটি ধসে নদীগর্ভে চলে গেছে।
ভাঙন রোধে ও মসজিদটিকে তাৎক্ষণিক ধসে পড়া থেকে রক্ষা করতে নদীর পাড়ে জিও ব্যাগ (বালুর বস্তা) ডম্পিং করা হলেও পানির তীব্র স্রোতের মুখে এই অস্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে চরম সংশয় ও আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় মুসল্লি ও বাসিন্দারা। মসজিদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা অসহায় মানুষের চোখে-মুখে এখন কেবলই ভিটেমাটি ও ধর্মীয় উপাসনালয় হারানোর চরম আকুলতা। ইতোমধ্যে পিপড়াখালি গ্রামের হাওলাদার বাড়ি ও খান বাড়ির প্রায় ২৫টি ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে।
স্থানীয় বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য শাহাজাহান খান ও আব্দুর রব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘বছরের পর বছর ধরে এখানে ভাঙন চললেও সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে কোনো স্থায়ী সমাধান পাচ্ছি না। চোখের সামনে আমাদের ঘরবাড়ি যাচ্ছে, এখন এই কুয়েতি মসজিদটিও অল্প কয়েক দিনের মধ্যে পায়রার পেটে চলে যাবে।’’
এছাড়াও চলতি বর্ষা মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ভাঙন দেখা দিয়েছে মাধবখালি ইউনিয়নের রামপুরা; মির্জাগঞ্জ ইউনিয়নের ভিকাখালি, সুন্দ্রা-কালিকাপুর, পিপড়াখালি ও চিংগড়িয়া; দেউলী সুবিদখালী ইউনিয়নের গোলখালী, চরখালি, মেন্দিয়াবাদ ও রানিপুর; কাকড়াবুনিয়া ইউনিয়নের কাকড়াবুনিয়া বাজার ও কেওয়াবুনিয়া স্লুইসগেট এবং মজিদবাড়িয়া ইউনিয়নের ভয়াং বাজার লঞ্চঘাট, মজিদবাড়িয়া ও কুতবারচর এলাকায়। প্রতি বছরই এসব এলাকায় ভাঙন দেখা দেয়। কোন কোন স্থানে ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে ফসল নষ্ট হয় এবং বাড়ি তলিয়ে পানিবন্দী হয়ে পড়ে এলাকাবাসী।
মির্জাগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবুল বাশার নাসির বলেন, ‘‘যুগ যুগ ধরে ভাঙনের ফলে আমার ইউনিয়নের মানচিত্র প্রতিনিয়ত ছোট হয়ে আসছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার জানালেও কোনো লাভ হচ্ছে না। এভাবে শুধু বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানো যাবে না, ব্লক স্থাপনের মাধ্যমে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা না গেলে মির্জাগঞ্জকে মানচিত্র থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।’’
এ বিষয়ে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাকিব জানান, মির্জাগঞ্জ ইউনিয়নের পায়রা নদীর ভাঙন রোধে বর্তমানে একটি সমীক্ষার কাজ চলমান রয়েছে। সমীক্ষার সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তীতে স্থায়ী কাজ শুরু করা হবে।
মির্জাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মোঃ রাসেল জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে ভাঙন রোধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই ধীরগতির সমীক্ষা ও আশ্বাসের ওপর আর ভরসা রাখতে পারছেন না ভাঙনকবলিত দিশেহারা মানুষ। চোখের সামনে ঐতিহ্যবাহী কুয়েতি মসজিদসহ নিজেদের শেষ সম্বলটুকু নদীগর্ভে চিরতরে তলিয়ে যাওয়ার আগেই দ্রুত ও স্থায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন মির্জাগঞ্জবাসী।







