নারিকেলের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত পটুয়াখালীর বাউফলে গত কয়েক বছরে আশঙ্কাজনকভাবে নারিকেলের ফলন কমে গেছে। একসময়ের প্রমোদ ও বাণিজ্যিক এই ফসলের ফলন প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ায় চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় চাষিরা। ফলন বিপর্যয়ের জন্য অনেকে মোবাইল টাওয়ারের ক্ষতিকর তরঙ্গকে দায়ী করলেও কৃষিবিদরা একে কেবলই একটি ভ্রান্ত ধারণা হিসেবে দেখছেন।
স্থানীয় চাষি ও কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, অতীতে বাউফলের প্রতিটি বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক বাগানগুলোতে সারি সারি গাছে ঝুলত থোকা থোকা নারিকেল। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব নারিকেল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হতো। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ গাছেই দেখা দিয়েছে ফলশূন্যতা।
উপজেলার শৌলা গ্রামের নুরজাহান গার্ঢেনে কয়েক প্রজাতির প্রায় ৭শ নারিকেল গাছ রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৫শ গাছ ফল দিত। তবে গত কয়েক বছরে ফলন নেই বললেই চলে। এতে অনেকটা হতাশ হয়ে পড়েছেন বাগান মালিক।
নারিকেল বাগান দেখা শোনার দায়িত্বে থাকা মো. নিরব হোসেন বলেন, ‘‘গাছে প্রচুর ফল হত। তবে অজানা কারণে গত দুই/তিন বছর ধরে ফলন কমে গেছে। প্রায় গাছই ফল শূণ্য। দুই একটি গাছে ফলন এলেও তা ঝড়ে যায়।’’
চর কালাইয়া গ্রামের কৃষক মো. জিয়া প্যাদা বলেন, ‘‘বাড়িতে ১০/১২ টি গাছ আছে। এতে অনেক নারিকেল হত। তা বাজারে বিক্রি করে বছরে অনেক টাকা আয় হতো। তবে এখন গাছে নারিকেল ফল হয় না। যে ফুল আসে তা ঝড়ে পড়ে যায়।’’
উপকূলীয অঞ্চলে নারিকেলের ফলন কমে যাওয়ার কারণ নিয়ে রয়েছে নানা আলোচনা। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ারের ক্ষতিকর তরঙ্গের কারণে কমছে নারিকেলের ফলন।
চর মিয়াজান গ্রামের বাসিন্দা লোকমান মাঝি মনে করেন, যখন এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ার ছিল না তখন অনেক নারিকেল উৎপাদিত হতো। যখন থেকে মোবাইল টাওয়ার বাড়তে শুরু করছে তখন থেকেই ফলন কমে গেছে।
তবে কৃষিবিদ ও সচেতন চাষিরা মোবাইল টাওয়ারের প্রভাবের বিষয়টিকে ভ্রান্ত ধারণা বলেই মনে করছেন। তাদের মতে, ‘‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি এবং রোগবালাইয়ের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় নারিকেলের ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি সময়মতো রোগ দমন ও পরিচর্যার অভাবও উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।’’
উপজেলা উপ- সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. রেদওয়ান তালুকদার জানান, ফলন কমে যাওয়ার সাথে মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ারের তরঙ্গের প্রভাবের কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখা পাওয়া যায়নি। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে পরিবেশে পোকামাকড় সহ বিভিন্ন রোগ বালাইয়ের প্রকোপ বেড়ে গেছে। এজন্য ফলন কমছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মিলন বলেন, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে হোয়াইট ফ্লাইসহ বিভিন্ন পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ বেড়েছে। গুজবে কান না দিয়ে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত পরিচর্যা এবং রোগবালাই দমনে কার্যকর ব্যবস্থা নিলেই ফলন বাড়বে। এজন্য কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে চাষিদের সকল ধরনের পরামর্শ ও সহযোগিতা করা হচ্ছে বলেও এসময় জানান তিনি।







