কলাপাড়া প্রতিনিধি : পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে একটি রূপান্তরিত আর্টিসানাল ট্রলিং বোটে মাত্র দুই দিনের শিকারে প্রায় ৮০ মণ ইলিশ ধরা পড়েছে। এ ঘটনার পর থেকেই সাধারণ জেলেদের মনে বড়ো প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—একটি বোট যদি মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় ৮০ মণ ইলিশ তুলে নিতে পারে, তবে দিনরাত পরিশ্রম করেও সাধারণ জেলেদের জালে মাছ মিলছে না কেন?
গত বুধবার (২৬ আগস্ট) বিকেলে বিপুল পরিমাণ এই ইলিশ নিয়ে ‘এফবি আব্দুল্লাহ’ নামের ট্রলারটি আলিপুর মৎস্য বন্দরে ফিরে আসে। পরে ‘সিফাত ফিশ’ আড়তে নিলামের মাধ্যমে মাছগুলো প্রায় ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়।
ট্রলারটির মাঝি বাদশা জানান, চার দিন আগে ১৮ জন জেলেকে নিয়ে তারা গভীর সমুদ্রে যান। দুই দিন মাছ ধরার পর গত মঙ্গলবার পায়রা বন্দরের শেষ বয়া সংলগ্ন এলাকায় তাদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ে। তবে পাওয়া মাছগুলোর আকার তুলনামূলক ছোট বলে জানান তিনি।
কুয়াকাটা, মহিপুর, আলিপুর ও আশাখালী উপকূলের সাধারণ জেলেদের অভিযোগ, তারা দিনের পর দিন সাগরে থেকেও আশানুরূপ মাছ পাচ্ছেন না। উল্টো অনেক সময় জ্বালানি, বরফ, খাবার ও শ্রমিকের খরচ তুলতে না পেরে লোকসান গুনে তীরে ফিরতে হয়।
অভিজ্ঞ জেলে হানিফ মাঝি আক্ষেপ করে বলেন, আগে অল্প সময়েই পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন সমুদ্রে থেকেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। তার মতে, কিছু অসাধু ট্রলিং বোট ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস ও রাডারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছের ঝাঁক শনাক্ত করছে এবং সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল দিয়ে একসঙ্গে সব মাছ সাবাড় করে দিচ্ছে। এতে সাধারণ জেলেদের জালে মাছ ধরা পড়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
জেলেদের আশঙ্কা, এসব জালে বড় ইলিশের পাশাপাশি ছোট ইলিশ ও সামুদ্রিক প্রাণীর পোনাও নির্বিচারে আটকা পড়ছে। চলতি মাসের শুরুতেও কুয়াকাটা সংলগ্ন সাগরে আরেকটি অবৈধ আর্টিসানাল ট্রলিং ট্রলারের জালে একবারেই ৪৬ মণ ইলিশ ধরা পড়েছিল, যা প্রায় সাড়ে ৪৮ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। অল্প ব্যবধানে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে প্রশ্ন উঠেছে—সাগরে কি ইলিশের প্রাচুর্য ফিরেছে, নাকি আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় নির্দিষ্ট ঝাঁকগুলো দ্রুত নিঃশেষ করা হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি শুধু কত মণ মাছ ধরা পড়ল তা দিয়ে মূল্যায়ন করলে চলবে না; বরং কোন বোটে, কী ধরনের জাল ব্যবহার করে এবং কী আকারের মাছ ধরা হচ্ছে, তা কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. রাজিব সরকার বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি অবৈধ জালের ব্যবহারও ইলিশ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। ছোট ইলিশ বড় হওয়ার সুযোগ না পেলে ভবিষ্যতে প্রজননক্ষম মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যও চরম হুমকির মুখে পড়বে।’
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা জানান, সামুদ্রিক মৎস্য আইনের তফসিল অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অবৈধ জাল ব্যবহার করে ট্রলিং করার অভিযোগে বোট মালিকদের মাইকিং করে সতর্ক করা হয়েছে এবং এর আগে বেশ কয়েকটি বোট জব্দ করে মামলাও করা হয়েছে।
অবৈধ ট্রলিং বোটের আগ্রাসন রোধ করে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ রক্ষা এবং সাধারণ জেলেদের জীবিকা টিকিয়ে রাখতে প্রশাসনের আরও কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয় মৎস্যজীবীরা।







